

বিজ্ঞানকে বিশ্বাস করেও কেন মানুষ ষড়যন্ত্রতত্ত্বে ভোলে? একটি অদ্ভুত ধাঁধার সমাধান
কল্পনা করুন, একটি বিশাল জনমত জরিপে দেখা গেল ১৬টি দেশের ৭০ শতাংশ মানুষ অন্তত একটি ভুল বা অপ্রমাণিত স্বাস্থ্যসংক্রান্ত দাবি বিশ্বাস করেন। অথচ একই সময়ে দেখা যাচ্ছে, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা কমলেও বিজ্ঞানের প্রতি সাধারণ মানুষের ভরসা কিন্তু এখনো বেশ উঁচুতে। তাহলে সমস্যাটা কোথায়? বিজ্ঞানের ওপর আস্থা থাকা সত্ত্বেও কেন মানুষ ভ্যাকসিন বা উড়োজাহাজের 'কেমট্রেইল' সংক্রান্ত অদ্ভুত সব ষড়যন্ত্রতত্ত্বে (Conspiracy Theory) বিশ্বাস করছে? সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, এটি বিজ্ঞানের প্রতি আস্থার অভাব নয়, বরং বিজ্ঞান 'কীভাবে কাজ করে' তা নিয়ে একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক বিভ্রান্তি। সমস্যাটি তথ্যের অভাব নয়, বরং বিজ্ঞানের মুখোশ চিনে নেওয়ার সক্ষমতার অভাব।
'একাকী প্রতিভা' বা 'লোন জিনিয়াস' এর মায়াজাল
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এবং পপ-কালচার বিজ্ঞানকে যেভাবে উপস্থাপন করে, তার মধ্যে একটি নাটকীয় কিন্তু বিপজ্জনক গলদ রয়েছে। স্কুলে সাধারণত বিজ্ঞানকে শেখানো হয় কিছু মহান অর্জনের রৈখিক পর্যায়ক্রম হিসেবে। অন্যদিকে, চলচ্চিত্র বা ডকুমেন্টারিগুলোতে বিজ্ঞানের জয়গান গাওয়া হয় একজন 'একাকী প্রতিভা' বা 'লোন জিনিয়াস'-এর লড়াই হিসেবে।
এই কাহিনীগুলোর একটি চিরচেনা ছক থাকে: সমাজ এক মহাবিপদে আক্রান্ত, তখন এক অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন প্রতিভার আবির্ভাব ঘটে। তিনি একটি যুগান্তকারী সমাধান নিয়ে আসেন, কিন্তু সমাজ তাকে অবজ্ঞা করে, বিদ্রূপ করে। অনেক ব্যক্তিগত যন্ত্রণার পর অবশেষে সবাই বুঝতে পারে যে তিনিই সঠিক ছিলেন। এই হিরো-ন্যারেটিভ বা বীরত্বগাঁথা আমাদের অবচেতনে গেঁথে যায়। ষড়যন্ত্রতাত্ত্বিকরা এই মনস্তত্ত্বকে সুকৌশলে ব্যবহার করেন। তারা মানুষকে বোঝাতে চান যে, যারা এই তত্ত্বগুলো বিশ্বাস করছে তারা আসলে অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি বুদ্ধিমান এবং বাকিরা সবাই 'ব্রেইনওয়াশড' বা মোহগ্রস্ত। এই আখ্যানটি বিশ্বাসীকে একধরণের আভিজাত্যের অনুভূতি দেয়।
"রেনেসাঁ যুগের সন্ন্যাসী জিওর্দানো ব্রুনো—যাকে মহাবিশ্বের অসীমতা নিয়ে কথা বলার জন্য পুড়িয়ে মারা হয়েছিল—থেকে শুরু করে গণিতবিদ জন ন্যাশ-এর জীবনভিত্তিক চলচ্চিত্র 'এ বিউটিফুল মাইন্ড' পর্যন্ত, এই 'লোন জিনিয়াস' ঘরানাটি শতাব্দী ধরে বিজ্ঞানের জনপ্রিয় চিত্রায়নে মিশে আছে। ষড়যন্ত্রতাত্ত্বিকরা এই ধারণাটি ব্যবহার করে বোঝাতে চান যে, সত্য কেবল কোনো এক নিঃসঙ্গ প্রতিভার কাছেই ধরা দেয়, যা মূলধারার প্রতিষ্ঠানগুলো অস্বীকার করছে।"
কিন্তু এই রোমান্টিক আখ্যানটি বিজ্ঞানের আসল রূপটিকে আড়াল করে দেয়। বিজ্ঞান কোনো একজনের একক 'ইউরেকা' মুহূর্ত নয়, বরং এটি হাজারো মানুষের সম্মিলিত এবং প্রায়ই 'একঘেয়ে' একটি পরিশ্রমসাধ্য প্রক্রিয়া।
'বৈজ্ঞানিকতা'র ছদ্মবেশ
মানুষ যখন বিজ্ঞানের আসল পদ্ধতি বা টেকনিক্যাল বিষয়গুলো বোঝে না, তখন তারা বিজ্ঞানের কিছু বাহ্যিক চিহ্নের ওপর ভিত্তি করে কোনো তথ্য বিশ্বাস করতে শুরু করে। একে বলা হয় 'Scientificity' বা বিজ্ঞানের বাহ্যিক ছদ্মবেশ। জটিল শব্দভাণ্ডার, চার্ট, সংখ্যা বা দামী যন্ত্রপাতির উপস্থিতি থাকলেই সাধারণ মানুষ সেটিকে বিজ্ঞান বলে ধরে নেয়। এটি আসলে একটি 'স্মোকস্ক্রিন' বা ধোঁয়াশা হিসেবে কাজ করে।
সোশ্যাল মিডিয়ার একটি বিশাল ডেটাসেট বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রায় ৮.৭ মিলিয়ন টুইটার (X) পোস্টে যখন 'ইউনিভার্সিটি', 'স্টাডি' বা 'বিজ্ঞানী'র মতো শব্দগুলো ব্যবহার করা হয়, তখন সেই পোস্টগুলোর শেয়ার হওয়ার হার বহুগুণ বেড়ে যায়। উদ্বেগের বিষয় হলো, এটি বিশেষ করে সেইসব তথ্যের ক্ষেত্রে বেশি ঘটে যেগুলোর সত্যতা বা নির্ভরযোগ্যতা অত্যন্ত কম। মানুষ পদ্ধতির চেয়ে বিজ্ঞানের 'সাউন্ড' বা আওয়াজকে বেশি বিশ্বাস করছে।
এর একটি ধ্রুপদী উদাহরণ হলো জনপ্রিয় পডকাস্টার জো রোগান-এর একটি পর্ব। সেখানে ইতালীয় রসায়নবিদ কোরাডো মালাঙ্গা এবং রাডার গবেষক ফিলিপ্পো বিয়ন্ডি দাবি করেন যে, স্যাটেলাইট রাডার ব্যবহার করে তারা মিশরের পিরামিডের দুই কিলোমিটার নিচে একটি ভিনগ্রহী শহর খুঁজে পেয়েছেন। যদিও প্রত্নতাত্ত্বিকরা দ্রুতই জানান যে এই রাডার মাটির কয়েক মিটারের বেশি দেখতে পায় না, তবুও লক্ষ লক্ষ মানুষ এই 'বৈজ্ঞানিক' আলোচনাটি বিশ্বাস করেছে। কারণ সেখানে 'রাডার' বা 'স্যাটেলাইট'-এর মতো বিজ্ঞানের কিছু চেনা চিহ্ন বা কিউ (Cue) ব্যবহার করা হয়েছিল।
বিজ্ঞানের আসল শক্তি: 'একঘেয়ে' সম্মিলিত প্রক্রিয়া
বিজ্ঞানের প্রকৃত শক্তি কোনো একক ব্যক্তির অলৌকিক অন্তর্দৃষ্টি বা ইনটুইশন (Intuition) নয়। বরং এটি হলো পিয়ার রিভিউ (Peer Review)—যেখানে একজন বিজ্ঞানীর কাজ অন্য সমমানের বিশেষজ্ঞরা কঠোরভাবে পরীক্ষা করেন; এবং রেপ্লিকেশন (Replication)—যেখানে একটি পরীক্ষা বারবার করে দেখা হয় একই ফলাফল আসে কি না।
গবেষণাপত্রে যখন বিজ্ঞানীরা 'হয়তো' বা 'সম্ভবত' এর মতো শব্দ ব্যবহার করেন, সাধারণ মানুষ সেটিকে বিজ্ঞানের দুর্বলতা মনে করে। কিন্তু বাস্তবে এই দ্বিধাই বিজ্ঞানের সততা ও শক্তির লক্ষণ। বিজ্ঞানে কোনো বিষয়ে ঐকমত্য বা 'কনসেনসাস' (Consensus) তৈরি হওয়া মানে এই নয় যে সবাই অন্ধভাবে কোনো কিছু মেনে নিচ্ছে। এটি আসলে একটি দীর্ঘস্থায়ী বিতর্কের ফসল, যেখানে প্রমাণের ভিত্তিতে একে অপরের ভুল ধরিয়ে দেওয়া হয়। এই সম্মিলিত প্রক্রিয়াটিই বিজ্ঞানকে নির্ভরযোগ্য করে তোলে।
পডকাস্ট বনাম বিশেষজ্ঞ: তথ্যের উৎসের প্রভাব
৮৪৩ জন মার্কিন নাগরিকের ওপর করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা বিজ্ঞান শেখার জন্য বিশেষজ্ঞ সূত্রের চেয়ে পডকাস্ট বা অনানুষ্ঠানিক ডকুমেন্টারি বেশি পছন্দ করেন, তাদের মধ্যে ষড়যন্ত্রতত্ত্বে বিশ্বাস করার প্রবণতা অনেক বেশি। মজার ব্যাপার হলো, এই প্রভাব মানুষের শিক্ষা বা রাজনৈতিক অবস্থানের চেয়েও বেশি শক্তিশালী।
এখানে একটি চমকপ্রদ পর্যবেক্ষণ আছে: যাদের বিজ্ঞানের ওপর আস্থা মাঝারি বা কম, তারা যদি 'লোন জিনিয়াস' তত্ত্বে বিশ্বাস করে, তবে তাদের ষড়যন্ত্রতত্ত্বে বিশ্বাস করার সম্ভাবনা নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়। তবে যাদের বিজ্ঞানের ওপর আস্থা অত্যন্ত বেশি, তাদের ক্ষেত্রে এই 'জিনিয়াস মেন্টালিটি' কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলে না। অর্থাৎ, আপনি বিজ্ঞানকে কীভাবে দেখছেন-একজন বীরের লড়াই হিসেবে নাকি একটি পদ্ধতিগত প্রক্রিয়া হিসেবে-সেটিই নির্ধারণ করে আপনি ভুল তথ্যের জালে আটকা পড়বেন কি না।
একজন 'সক্ষম বহিরাগত' হয়ে ওঠা
ষড়যন্ত্রতত্ত্বের এই জোয়ার রুখতে কেবল 'বিজ্ঞানকে বিশ্বাস করুন'-এই স্লোগানটি আর যথেষ্ট নয়। কারণ মানুষ বিজ্ঞানকে বিশ্বাস করেও ভুল পথে চালিত হচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত একজন 'সক্ষম বহিরাগত' (Competent Outsider) হয়ে ওঠা। একজন সক্ষম বহিরাগত নিজে বিজ্ঞানী নন, কিন্তু তিনি জানেন কোনো একটি তথ্যের উৎস বা 'প্রোভেন্যান্স' (Provenance) কীভাবে যাচাই করতে হয়। তিনি জানেন যে জ্ঞান কোনো একক ব্যক্তির মস্তিস্ক থেকে আকাশবাণীর মতো আসে না, বরং তা তৈরি হয় সম্মিলিত যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে।
আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় কেবল বৈজ্ঞানিক ফলাফল বা থিওরি মুখস্থ করানো বন্ধ করতে হবে। তার বদলে শেখাতে হবে বিজ্ঞানের দৈনন্দিন কাজ করার ধরন। শিশুরা যদি বুঝতে শেখে যে বিজ্ঞানের ঐকমত্য কোনো 'গ্রুপথিংক' বা অন্ধ আনুগত্য নয়, বরং এটি হলো কঠোর পরীক্ষার পর টিকে থাকা সত্য, তবেই তারা আগামী দিনের মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে শক্ত ঢাল তৈরি করতে পারবে।
পৌঁছানো হয় সেই দীর্ঘ, কঠিন ও সম্মিলিত প্রক্রিয়াটিকেও সম্মান করতে শিখবে? ষড়যন্ত্রতত্ত্বের গোলকধাঁধা থেকে বের হওয়ার শেষে একটি প্রশ্ন রেখে যাই: আমরা কি আমাদের সন্তানদের কেবল বৈজ্ঞানিক তথ্য শেখাব, নাকি তারা কীভাবে সেই সত্যেএটিই সম্ভবত একমাত্র পথ।
Before you go ...
We're building a community of experts dedicated to rebuilding trust and serving the public by making knowledge available to everyone. Join us at the beginning of our journey and receive a curated list of articles in your inbox twice a week. Be among our first subscribers!






