
স্মার্ট সোশ্যাল সিকিউরিটি কার্ড: সম্ভাবনা, বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জ
BD Feature, Writter
বর্তমান বিশ্ব দ্রুত ডিজিটাল ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। রাষ্ট্র পরিচালনা, নাগরিক সেবা প্রদান, সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ—সব ক্ষেত্রেই তথ্যপ্রযুক্তি এখন কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক দলের প্রস্তাবিত “স্মার্ট সোশ্যাল সিকিউরিটি কার্ড” উদ্যোগটি দেশের ডিজিটাল গভর্ন্যান্স ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এই একক কার্ডের মাধ্যমে নাগরিকের জাতীয় পরিচয়পত্র (NID), কর শনাক্তকরণ নম্বর (TIN), স্বাস্থ্যসেবা তথ্য এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় প্রাপ্ত সকল সুবিধা একত্রে সংযুক্ত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এই ধারণার মূল চালিকা শক্তি নিহিত রয়েছে ডেটা সমন্বয় ও এডমিনিস্ট্রেটিভ ট্রান্সপারেন্সিতে । বর্তমানে বাংলাদেশে নাগরিকদের জন্য পৃথক পৃথক ডেটাবেস রয়েছে—নির্বাচন কমিশনের NID, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের TIN, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডিজিটাল স্বাস্থ্য তথ্য, এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ভাতা ও সহায়তা তালিকা। কিন্তু এই তথ্যভান্ডারগুলো একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত নয়। ফলে একাধিকবার নিবন্ধন, ভুয়া সুবিধাভোগী, তথ্যগত বিভ্রান্তি ও দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়। স্মার্ট সোশ্যাল সিকিউরিটি কার্ড এই বিচ্ছিন্ন কাঠামোকে একটি জাতীয় ডিজিটাল সেবা নেটওয়ার্কে রূপান্তর করতে পারবে।
বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশ ইতোমধ্যে এ ধরনের সমন্বিত নাগরিক সেবার সফল উদাহরণ রয়েছে। এস্তোনিয়ায় একটি ডিজিটাল আইডির (e-Residency) মাধ্যমেই নাগরিকরা স্বাস্থ্যসেবা, ব্যাংকিং, কর প্রদান এমনকি ভোটদানও করতে পারেন। ভারতে আধার, প্যান ও আয়ুষ্মান ভারত স্বাস্থ্য কার্ডের সমন্বয়ে একটি বিশাল ডিজিটাল সিটিজেন ইনফ্রাস্ট্রাকচার গড়ে উঠেছে। এসব উদাহরণ প্রমাণ করে যে, প্রযুক্তিগত দিক থেকে বাংলাদেশেও এ ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা সম্ভব।
তবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন একটি শক্তিশালী জাতীয় তথ্য বিনিময় প্ল্যাটফর্ম, যেখানে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার ডেটাবেস নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিত উপায়ে যুক্ত থাকবে। এখানে স্মার্ট কার্ডটি হবে একটি ডিজিটাল প্রবেশদ্বার, যা নাগরিকের তথ্য সরাসরি বহন না করে একটি এনক্রিপ্টেড পরিচয় চিহ্নের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ডেটা সিস্টেমে সংযুক্ত থাকবে। এর ফলে তথ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা যাবে এবং একই সঙ্গে দ্রুত সেবা প্রদান সম্ভব হবে।
এই ব্যবস্থার মাধ্যমে রাষ্ট্র যেমন ভুয়া সুবিধাভোগী শনাক্ত করতে পারবে, তেমনি প্রকৃত দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে তাদের প্রাপ্য সহায়তা পাবে। হাসপাতাল থেকে শুরু করে খাদ্য সহায়তা, ভাতা গ্রহণ থেকে কর সংক্রান্ত যাচাই, ভূমি মালিকানা নিবন্ধনসহ সকল নাগরিক সুবিধা একক কার্ডের আওতায় সহজ ও কার্যকর হয়ে উঠবে। এতে প্রশাসনিক ব্যয় কমবে, সেবার গতি বাড়বে, নাগরিকদের হয়রানি হ্রাস পাবে এবং দুর্নীতি প্রায় শূণ্যের কোঠায় নিয়ে আসা সম্ভব হবে। এছাড়া আইন প্রয়োগকারী সংস্থা খুব সহজেই অপরাধীদের সনাক্ত করতে পারবে এবং দ্রুত কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে পারবে, ফলে অপরাধ প্রবণতাও হ্রাস পাবে।
তবে এই সম্ভাবনার পাশাপাশি রয়েছে গুরুতর ঝুঁকি। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো নাগরিক গোপনীয়তা ও তথ্যের নিরাপত্তা। একটি কেন্দ্রীয় নাগরিক তথ্যভান্ডার যথাযথ আইন ও স্বাধীন নজরদারি ছাড়া চালু হলে তা রাজনৈতিক অপব্যবহার, নজরদারি ও নাগরিক স্বাধীনতা হরণের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশে এখনো একটি পূর্ণাঙ্গ ও শক্তিশালী ডেটা প্রটেকশন আইন কার্যকর হয়নি, যা এই ধরনের প্রকল্পের জন্য অত্যাবশ্যক। অতএব, স্মার্ট সোশ্যাল সিকিউরিটি কার্ড বাস্তবায়নের আগে অবশ্যই একটি স্বাধীন ডেটা সুরক্ষা কমিশন, কার্যকরী সাইবার নিরাপত্তা কাঠামো, এবং নাগরিক অধিকার রক্ষায় সুস্পষ্ট আইন প্রণয়ন করতে হবে। একই সঙ্গে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জনসচেতনতা নিশ্চিত করাও জরুরি।
স্মার্ট সোশ্যাল সিকিউরিটি কার্ড কেবল একটি প্রযুক্তি প্রকল্প নয়; এটি একটি আধুনিক, স্বচ্ছ ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনের রূপরেখা। সঠিক পরিকল্পনা, আইনগত সুরক্ষা ও নৈতিকতার সমন্বয় ঘটাতে পারলে এই উদ্যোগ বাংলাদেশকে একটি সত্যিকারের ডিজিটাল কল্যাণ রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করতে পারে।
লেখকঃ খন্দকার ওয়ালীউল্লাহ, প্রভাষক, আইসিটি বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।
Before you go ...
We're building a community of experts dedicated to rebuilding trust and serving the public by making knowledge available to everyone. Join us at the beginning of our journey and receive a curated list of articles in your inbox twice a week. Be among our first subscribers!
