
‘সুপার এল নিনো’ এবং আমাদের মহাসাগর: কেন এটি কেবল একটি প্রাকৃতিক বিপর্যয় নয়
জলবায়ু সংকট ও ‘সুপার এল নিনো’র পদধ্বনি
২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে আমরা এক চরম জলবায়ু সংকটের মুখোমুখি। বৈজ্ঞানিক তথ্য বলছে, চলতি বছরের শেষ নাগাদ একটি ‘সুপার এল নিনো’ (Super El Niño) তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা ৬০ শতাংশের বেশি। যখন গ্রীষ্মমন্ডলীয় প্রশান্ত মহাসাগরের পৃষ্ঠদেশের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ২° সেলসিয়াসের বেশি বেড়ে যায়, তখন তাকে আমরা ‘সুপার এল নিনো’ বলি।
এটি কেবল সমুদ্রের পানি গরম হওয়া নয়; বরং এটি আমাদের বৈশ্বিক তাপমাত্রাকে রেকর্ড উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার এক শক্তিশালী অনুঘটক। কিন্তু সাধারণ একজন মানুষের জন্য এর অর্থ কী? কেন আমাদের খাবারের থালায় মাছের দাম বাড়ছে কিংবা কেন সমুদ্রের পাড়ে হাজার হাজার সামুদ্রিক প্রাণীর নিথর দেহ পড়ে থাকছে? এই নিবন্ধে আমরা আলোচনা করব কীভাবে সুপার এল নিনো আমাদের মহাসাগরের ভারসাম্য নষ্ট করছে এবং কেন এর প্রভাব প্রতিটি মানুষের জীবনকে স্পর্শ করছে।
মহাসাগরের 'অদৃশ্য দেয়াল': পুষ্টির অভাব ও খাদ্য শৃঙ্খলের বিপর্যয়
সুপার এল নিনোর সবচেয়ে বিধ্বংসী দিক হলো সমুদ্রের পানির ‘তাপীয় স্তরায়ন’ (Thermal Stratification)। সহজভাবে বললে, গরম পানি হালকা হওয়ার কারণে সমুদ্রের উপরিভাগে জমা হয় এবং নিচের শীতল ও পুষ্টিসমৃদ্ধ পানির ওপর একটি ‘ঢাকনা’ (Lid) হিসেবে কাজ করে। এই অদৃশ্য দেয়াল বা ঢাকনার কারণে নিচের পুষ্টি উপাদানগুলো উপরে আসতে পারে না।
প্রশান্ত মহাসাগরের হুমবোল্ট কারেন্ট (Humboldt current) সাধারণত একটি ‘আপওয়েলিং’ (Upwelling) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গভীর থেকে শীতল ও পুষ্টিসমৃদ্ধ পানি উপরিভাগে নিয়ে আসে, যা এই অঞ্চলকে বিশ্বের অন্যতম উৎপাদনশীল সামুদ্রিক অঞ্চলে পরিণত করে। কিন্তু এল নিনোর সময় এই আপওয়েলিং প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে সামুদ্রিক খাদ্য শৃঙ্খলের মূল ভিত্তি ‘ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন’ (Phytoplankton) তৈরি হতে পারে না। যখন ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন কমে যায়, তখন জুপ্ল্যাঙ্কটন থেকে শুরু করে বিশাল তিমি পর্যন্ত পুরো খাদ্য শৃঙ্খল ভেঙে পড়ে। এটি কেবল একটি সামুদ্রিক সমস্যা নয়, বরং প্রকৃতির সামগ্রিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার এক অশনিসংকেত।
পেরুর একটি ছোট মাছ এবং বিশ্ববাজারের হাহাকার
বিশ্বের মৎস্য অর্থনীতির একটি বড় স্তম্ভ হলো ‘পেরুভিয়ান আনচোভেটা’ (Peruvian anchoveta)। এই মাছের বাণিজ্য বার্ষিক প্রায় ১-৩ বিলিয়ন ডলারের। বিশ্বের মোট ফিশমিল বা মাছের খাবারের ২০ শতাংশই আসে এই ছোট মাছটি থেকে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিশ্বজুড়ে মাছ চাষ বা একোয়াকালচারের জন্য যে খাবার ব্যবহৃত হয়, তার প্রায় অর্ধেকই এই আনচোভেটা থেকে তৈরি।
তাই পেরুর উপকূলে যখন সুপার এল নিনোর প্রভাবে আনচোভেটা মাছের আকাল দেখা দেয়, তখন বিশ্ববাজারে মাছের খাবারের দাম রেকর্ড টনপ্রতি ২,৫০০ ডলারে পৌঁছে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে আপনার স্থানীয় বাজারে; চাষ করা মাছ যেমন তেলাপিয়া, পাঙাশ বা স্যামনের দাম সাধারণের নাগালের বাইরে চলে যেতে থাকে।
"১৯৭২ এবং ১৯৭৩ সালের সুপার এল নিনোর সময় পেরুর মাছ ধরার পরিমাণ যথাক্রমে ৫৫% এবং ৫১% হ্রাস পেয়েছিল। এই ধস কেবল এল নিনোর কারণেই নয়, বরং মাছের সংখ্যা কমতে থাকা সত্ত্বেও অতিরিক্ত মাছ ধরার (High fishing pressure) কারণে হয়েছিল। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে সরকারকে মৎস্য আহরণে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে হয়েছিল।"
Met Office, CC BY
যখন মাছের অভাব 'যুদ্ধ' ডেকে আনে
সুপার এল নিনোর প্রভাবে সমুদ্রের বাস্তুসংস্থান বদলে যাওয়ায় মাছের ঝাঁক তাদের স্বাভাবিক বিচরণস্থল পরিবর্তন করে। ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূলে স্কুইড উধাও হওয়া কিংবা ভারত মহাসাগরে টুনা মাছের উৎপাদন কমে যাওয়া এর বড় প্রমাণ।
মাছের এই অভিবাসন নতুন ভূ-রাজনৈতিক সংকটের জন্ম দিচ্ছে। দক্ষিণ চীন সাগরের মতো বিতর্কিত অঞ্চলে মাছের সন্ধানে মৎস্যজীবীরা অন্য দেশের ‘এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন’ (EEZ) বা একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রবেশ করছে। এর ফলে দেশগুলোর মধ্যে ‘ফিশ ওয়ার’ (Fish Wars) বা সীমান্ত উত্তেজনা বাড়ছে। অর্থাৎ, একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ কীভাবে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও সম্পর্কে ফাটল ধরাতে পারে, সুপার এল নিনো তার এক জ্বলন্ত উদাহরণ।

Anchovy stocks in Peru are likely to be seriously affected. Corrado Baratta/Shutterstock
সিল এবং সমুদ্রসিংহের হাহাকার: ক্ষুধার্ত মহাসাগর
গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জ এবং পেরু উপকূলে সুপার এল নিনোর প্রভাব অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। সামুদ্রিক খাবারের অভাবে ফার সিল এবং সমুদ্রসিংহ ব্যাপক হারে অনাহারে মারা যাচ্ছে।
পুষ্টির অভাবে মাছের ঝাঁক গভীরে চলে যাওয়ায় মা সিলদের খাবারের সন্ধানে আগের চেয়ে অনেক বেশি সময় সমুদ্রে থাকতে হচ্ছে। ফলে উপকূলে ফেলে যাওয়া তাদের সন্তানরা দীর্ঘ সময় দুধ ও খাবারের অভাবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। এছাড়াও, এল নিনোর ফলে সৃষ্ট বিষাক্ত শ্যাওলা বা ‘অ্যালগাল ব্লুম’ (Algal blooms) থেকে নির্গত টক্সিন তিমির মতো বিশাল প্রাণীদের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বন্যপ্রাণীদের এই টিকে থাকার লড়াই আমাদের সমুদ্রের অসুস্থতারই বহিঃপ্রকাশ।
বিলুপ্তপ্রায় সামুদ্রিক আবাসন: কোরাল, কেল্প ও ম্যানগ্রোভ
অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে সামুদ্রিক আবাসস্থলগুলো ধ্বংসের মুখে পড়ছে। প্রবাল প্রাচীর বা কোরাল রিফ ‘ব্লিচিং’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মারা যাচ্ছে, যা মেক্সিকো ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলোতে ২০২৩-২৪ সালের এল নিনোর সময় প্রকটভাবে দেখা গেছে।
কেবল কোরাল নয়, অস্ট্রেলিয়ার উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ বনগুলোও এই তাপপ্রবাহে প্রাণ হারাচ্ছে। পাশাপাশি ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূলে সামুদ্রিক বনাঞ্চল বা ‘কেল্প ফরেস্ট’ (Kelp forest) ৫০-৭০% পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে। এই আবাসস্থলগুলো হারিয়ে যাওয়া মানে হলো অসংখ্য সামুদ্রিক প্রজাতির আশ্রয় ও প্রজনন কেন্দ্র চিরতরে বিলীন হয়ে যাওয়া, যার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব হবে ভয়াবহ।
একটি অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ এবং চিন্তাশীল প্রশ্ন
২০২৩-২৪ সালের এল নিনোর রেশ কাটতে না কাটতেই আরেকটি ‘সুপার এল নিনো’র সম্ভাবনা আমাদের মহাসাগরগুলোর জন্য এক চরম পরীক্ষা। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এই দুর্যোগগুলো এখন আগের চেয়ে বেশি শক্তিশালী এবং ঘনঘন আঘাত হানছে। সমুদ্রের এই প্রাণহীনতা এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রকৃতির প্রতিটি উপাদান একে অপরের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত।
আমাদের হাতে সময় খুব কম। সমুদ্র যখন নিজেই শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় আছে, তখন আমরা কি পারি এই সংকেতগুলো উপেক্ষা করার বিলাসিতা দেখাতে? নাকি আমাদের সমুদ্রের প্রাণ রক্ষার লড়াইয়ে এখনই নামা উচিত? ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো এই প্রশ্নগুলোর উত্তরের ওপর ভিত্তি করেই আমাদের বিচার করবে।
Before you go ...
We're building a community of experts dedicated to rebuilding trust and serving the public by making knowledge available to everyone. Join us at the beginning of our journey and receive a curated list of articles in your inbox twice a week. Be among our first subscribers!







