ইরান যুদ্ধে সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধ, জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ছয় মাস ধরে চলা যুদ্ধে সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ নিয়ে জবাবদিহির প্রশ্ন উঠেছে। বেসামরিক স্থাপনায় হামলা, পানির অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত করা এবং সামরিক অভিযানে বেসামরিকদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সতর্কতা নেওয়া হয়েছিল কি না—এসব বিষয় আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের আলোকে তদন্তের দাবি তুলেছে।
অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার আন্তর্জাতিক আইনের অধ্যাপক মেলানি ও’ব্রায়েন The Conversation-এ প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে এসব বিষয় তুলে ধরেছেন।
আন্তর্জাতিক মানবিক আইন বা যুদ্ধের আইন সশস্ত্র সংঘাতে যুদ্ধের পদ্ধতি ও উপায়কে সীমিত করে। এর অন্যতম উদ্দেশ্য হলো বেসামরিক মানুষ ও বেসামরিক স্থাপনার ওপর হামলা থেকে তাদের সুরক্ষা দেওয়া। স্কুল, হাসপাতাল, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র, কৃষি অবকাঠামো, বাঁধ ও পানি শোধনাগার—এসব সাধারণভাবে বেসামরিক স্থাপনা হিসেবে সুরক্ষিত।
আইন অনুযায়ী, সামরিক বাহিনীকে হামলার আগে বেসামরিক মানুষের মৃত্যু, আহত হওয়া এবং বেসামরিক স্থাপনার ক্ষতি কমাতে সম্ভাব্য সব ধরনের সতর্কতা নিতে হয়। একই সঙ্গে কোনো লক্ষ্যবস্তু সত্যিই সামরিক লক্ষ্য কি না, সেটিও যাচাই করতে হয়।
তবে কোনো স্থাপনা একই সঙ্গে বেসামরিক ও সামরিক কাজে ব্যবহৃত হলে সেটি নির্দিষ্ট শর্তে বৈধ সামরিক লক্ষ্য হতে পারে। কিন্তু হামলার ফলে বেসামরিক মানুষের ওপর যে ক্ষতি হবে, তা সামরিক সুবিধার তুলনায় মাত্রাতিরিক্ত হলে সেই হামলা নিষিদ্ধ হতে পারে।
মিনাবের স্কুলে হামলা
যুদ্ধের প্রথম দিনেই ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় মিনাব শহরের একটি মেয়েদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলার ঘটনা ঘটে। সেদিন ছিল শনিবার এবং স্কুলে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন। হামলায় অন্তত ১৫৬ জন নিহত হন, যাদের মধ্যে ১২০ জন শিশু বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, একটি স্কুল নিঃসন্দেহে বেসামরিক স্থাপনা। সেখানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা উপস্থিত থাকায় হামলাটি বেসামরিক মানুষের ওপরও আঘাত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
হামলায় একটি গাইডেড টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়ার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডারে রয়েছে।
স্কুলটির পাশে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (IRGC) কয়েকটি ভবন ছিল, যেগুলোও হামলার শিকার হয়। ফলে স্কুলে হামলাটি ভুল লক্ষ্য নির্ধারণের কারণে ঘটেছিল কি না, সে প্রশ্নও উঠেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসন হামলার দায় স্বীকার করেনি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রাথমিক মূল্যায়নে হামলার পেছনে মার্কিন বাহিনী থাকার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছিল এবং পুরোনো লক্ষ্যসংক্রান্ত তথ্য ব্যবহারের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছিল।
তবে এখনো যুক্তরাষ্ট্র ওই হামলার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রকাশ করেনি বলে বিশ্লেষণে বলা হয়েছে। লেখকের মতে, স্কুলটি ভুল করে হামলার শিকার হয়ে থাকলেও বেসামরিকদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সতর্কতা ও লক্ষ্য যাচাই করা হয়েছিল কি না, সেটি তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

A man holds a child’s backpack as rescue workers search through the rubble in the aftermath of a strike on the girls’ elementary school in Minab, Iran, on February 28 2026. Mehr News Agency/AP
পানির অবকাঠামোয় হামলা
জুনে হরমুজ প্রণালির কাছে হামলায় দুটি পানি সংরক্ষণাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসব স্থাপনা প্রায় ২০ হাজার বেসামরিক মানুষের পানির চাহিদা পূরণ করত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এসব স্থাপনায় হামলা ইচ্ছাকৃত ছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়। তবে ব্যবহৃত অস্ত্র এবং স্থাপনাগুলোর অবস্থান দেখে স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ হামলাটিকে পরিকল্পিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন।
মধ্যপ্রাচ্য অত্যন্ত শুষ্ক অঞ্চল হওয়ায় পানির সংকট সেখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। এ কারণে বেসামরিক মানুষের পানির সরবরাহের ওপর প্রভাব ফেলে—এমন স্থাপনায় হামলা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের দৃষ্টিতে গুরুতর বিষয় হতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষের বিরুদ্ধেই লবণমুক্তকরণ বা desalination plant-এ হামলার অভিযোগ উঠেছে।
বিচারের পথ কতটা কঠিন?
সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধের তদন্ত ও বিচারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বা ICC-এর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। লেখকের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—দুই দেশই ICC-এর সদস্য নয়। ফলে এই যুদ্ধে আদালতটির সরাসরি এখতিয়ার নেই।
এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট দেশগুলো নিজেরাই তদন্ত ও বিচার করতে পারে। অন্য কোনো দেশও নিজস্ব আদালতে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে মামলা করতে পারে। তবে বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে এ ধরনের মামলা করা অত্যন্ত জটিল এবং রাজনৈতিকভাবে কঠিন হতে পারে।
এ কারণে লেখকের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—উভয় দেশেরই সামরিক অভিযানের অভিযোগগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে তদন্ত করা এবং প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা প্রয়োজন।
তিনি মনে করেন, যুদ্ধাপরাধের ক্ষেত্রে জবাবদিহি শুধু ভুক্তভোগীদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার বিষয় নয়; ভবিষ্যতে একই ধরনের অপরাধ প্রতিরোধেও এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।


