
ফ্রয়েডের স্বপ্নতত্ত্ব: মনোবিশ্লেষণের ভিত্তি ও বিবর্তন
BD Feature, Writter
১৮৯৯ সালের শেষ ভাগে যখন সিগমুন্ড ফ্রয়েড তার ‘দ্য ইন্টারপ্রিটেশন অফ ড্রিমস’ (The Interpretation of Dreams) বইটি প্রকাশ করেন, তখন তিনি হয়তো জানতেন না যে এটি আধুনিক মনোবিজ্ঞানের মোড় ঘুরিয়ে দেবে। ফ্রয়েড নিজেই এই বইটিকে তার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান আবিষ্কার হিসেবে গণ্য করতেন । আজ ১২৫ বছর পরও বইটি কেবল মনোবিশ্লেষণের একটি প্রারম্ভিক দলিল হিসেবে নয়, বরং একটি সাহিত্যিক মাস্টারপিস হিসেবে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।
স্বপ্নের সেই ‘মানসিক অদ্ভুতুড়ে’ জগত ফ্রয়েডের মতে, স্বপ্ন কোনো সাধারণ শারীরিক প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি এক অন্য জগতে বা ভিন্ন এক ‘থিয়েটারে’ ঘটে চলা ঘটনা। তিনি একে বর্ণনা করেছেন “মানসিক অদ্ভুতুড়ে” (psychical strangeness) বিষয় হিসেবে। আমরা সচরাচর স্বপ্নে যা দেখি, তা অনেক সময় যুক্তিহীন বা অসংলগ্ন মনে হতে পারে। ফ্রয়েড মনে করতেন, এই অসংলগ্নতার পেছনেও একটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি রয়েছে। তিনি দাবি করেন যে, স্বপ্ন হলো এক ধরনের পরিশীলিত মানসিক প্রক্রিয়ার ফসল।
ইচ্ছা পূরণ ও সেন্সরশিপের খেলা ফ্রয়েডের তত্ত্বের মূল কথা হলো, প্রতিটি স্বপ্নের মূলে থাকে একটি সুপ্ত ইচ্ছা (wish fulfilment)। তিনি তার নিজের একটি স্বপ্নের উদাহরণ টেনে দেখিয়েছেন কীভাবে মনের গভীর কোনো আকাঙ্ক্ষা স্বপ্নে রূপ নেয়। তবে সব স্বপ্ন সরাসরি ধরা দেয় না। অনেক সময় আমাদের মনে এমন কিছু ইচ্ছা জাগে যা সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। তখন মন সেই ইচ্ছাকে ‘বিকৃত’ করে বা ছদ্মবেশে উপস্থাপন করে, যাকে ফ্রয়েড ‘স্বপ্ন-বিকৃতি’ (dream-distortion) বলেছেন। এটি অনেকটা রাজনৈতিক সেন্সরশিপের মতো কাজ করে, যাতে ঘুমন্ত মানুষটি তার নিজের অনাকাঙ্ক্ষিত ইচ্ছা দেখে জেগে না যায়।
ব্যক্ত বনাম সুপ্ত স্বপ্ন ফ্রয়েড স্বপ্নকে দুটি ভাগে ভাগ করেছেন: ১. ব্যক্ত বিষয়বস্তু (Manifest content): স্বপ্নে আমরা যা দেখি বা অনুভব করি। ২. সুপ্ত বিষয়বস্তু (Latent content): স্বপ্নের আড়ালে লুকিয়ে থাকা প্রকৃত অর্থ বা আকাঙ্ক্ষা। এই সুপ্ত ইচ্ছাকে ব্যক্ত স্বপ্নে রূপান্তর করার প্রক্রিয়াকে তিনি বলেছেন ‘স্বপ্ন-কাজ’ (dream-work)। এই কাজের মাধ্যমে মন অনেকগুলো স্মৃতি বা ভাবনাকে একটি বিন্দুতে নিয়ে আসে (Condensation) অথবা অনুভূতির লক্ষ্য পরিবর্তন করে দেয় (Substitution)।
ফ্রয়েড কি একজন ‘শার্লক হোমস’? ফ্রয়েড যেভাবে স্বপ্নের অর্থ উদ্ধার করতেন, তাকে অনেকেই গোয়েন্দা চরিত্র শার্লক হোমসের সাথে তুলনা করেন। তিনি শব্দের খেলা বা রূপকের মাধ্যমে স্বপ্নের জট খুলতেন। তবে সমালোচকদের মতে, ফ্রয়েডের এই বিশ্লেষণ অনেক সময় প্রমাণের চেয়ে তার নিজস্ব বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যাখ্যার ওপর বেশি নির্ভরশীল ছিল। আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান বা নিউরোসায়েন্সও এখন ফ্রয়েডের অনেক ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। বিজ্ঞানীদের মতে, ঘুমের রেম (REM) পর্যায়ে মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক স্পন্দনকে সাজানোর চেষ্টা থেকেই স্বপ্নের সৃষ্টি হয়, যা সবসময় কোনো অর্থ বহন করে না।
অস্তিত্বের গভীর রাজপথ এত সমালোচনা সত্ত্বেও ফ্রয়েডই প্রথম আমাদের শিখিয়েছিলেন যে আমাদের অবচেতন মনের গভীরে পৌঁছানোর ‘রাজকীয় পথ’ (royal road) হলো স্বপ্ন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকাময় স্মৃতি থেকে আসা ট্রমাটিক স্বপ্নগুলো ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি পরবর্তীকালে তার তত্ত্বে পরিবর্তন এনেছিলেন, যেখানে তিনি ‘পুনরাবৃত্তির বাধ্যবাধকতা’ (compulsion to repeat) বিষয়টি যুক্ত করেন।
বিংশ শতাব্দীতে মানুষের মন, মানসিক স্বাস্থ্য এবং থেরাপি সম্পর্কে আমাদের সামগ্রিক চিন্তাধারা গঠনে এই বইটির প্রভাব অনস্বীকার্য। আজও ফ্রয়েডের এই অমর সৃষ্টি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের তুচ্ছাতিতুচ্ছ অভিজ্ঞতার আড়ালেও লুকিয়ে থাকতে পারে গভীর কোনো জীবনরহস্য।
Before you go ...
We're building a community of experts dedicated to rebuilding trust and serving the public by making knowledge available to everyone. Join us at the beginning of our journey and receive a curated list of articles in your inbox twice a week. Be among our first subscribers!







