
চীনের ‘মহৎ ঐক্য’: অতীতকে নতুনভাবে গড়ে তুলে ভবিষ্যৎ রক্ষার লড়াই
BD Feature, Writter
বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপল-এ বর্তমানে একটি নতুন মতাদর্শ তৈরি করা হচ্ছে—যা বিপ্লবী কার্ল মার্কসের চেয়ে প্রাচীন দার্শনিক কনফুসিয়াসের কাছে বেশি ঋণী। যদিও চীন একটি একক দল শাসিত রাষ্ট্র, এর মূল আদর্শগত যুক্তিতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বর্তমানে "মহৎ ঐক্য" (datong) তত্ত্বের ওপর জোর দিচ্ছেন, যা চীনের ৫,০০০ বছরের ইতিহাসকে শ্রেণিসংগ্রাম হিসেবে না দেখে বরং বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর একটি একক সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রে শান্তিপূর্ণ "সংমিশ্রণ" হিসেবে উপস্থাপন করে ।
নতুন ভিত্তি: শ্রেণিসংগ্রাম থেকে সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতায় উত্তরণ
কয়েক দশক ধরে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি (CCP) সর্বহারা বিপ্লবের মাধ্যমে তাদের শাসনকে বৈধতা দিয়ে এসেছে। তবে গত দশকে সরকারি ভাষা থেকে "সর্বহারা" বা "সামন্তবাদ"-এর মতো শব্দগুলো প্রায় হারিয়ে গেছে; তার জায়গা নিয়েছে "সম্প্রদায়," "ধারাবাহিকতা," এবং "কনফুসিয়াস"। ২০২৩ সালের এক ভাষণে শি জিনপিং ঘোষণা করেন যে, রাজনৈতিক ঐক্য হলো "সাংস্কৃতিক ঐক্যের পূর্বশর্ত ও ভিত্তি"। তিনি দাবি করেন, চীনের বিভিন্ন নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী একটি আধ্যাত্মিক বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে একক জাতিতে পরিণত হয়েছে।
এই "মহৎ ঐক্য" তত্ত্বটি জাতীয় মর্যাদার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে। গবেষক লিউ ইউয়েজিন যুক্তি দেন যে, চীন হলো "একমাত্র নিরবচ্ছিন্ন সভ্যতা যা একটি রাষ্ট্রের রূপ নিয়েছে।" তিনি এই "শান্তিপূর্ণ সংস্কৃতিকে" পশ্চিমা মডেলের সাথে তুলনা করেন, যা তার মতে ব্যক্তিবাদ এবং "প্রতিযোগিতার আইনের" ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।
বৈশ্বিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা: ‘তিয়ানক্সিয়া’ দৃষ্টিভঙ্গি
এই মতাদর্শের প্রভাব চীনের সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূর বিস্তৃত। দার্শনিক ঝাও তিংয়াং-এর মতো প্রবক্তারা মনে করেন, প্রাচীন ‘তিয়ানক্সিয়া’ (tianxia) বা "আকাশের নিচে সবকিছু" ধারণাটি বিশ্বশান্তির একটি মডেল হতে পারে। এই দৃষ্টিভঙ্গি একটি "সামগ্রিক বিশ্ব-বীক্ষা" প্রচার করে যেখানে জাতিগুলো একে অপরের মূল্যবোধকে সম্মান করবে এবং একটি বৃহত্তর ঐক্যের অংশ হিসেবে "মহৎ ঐক্য" (datong) অর্জন করবে।
তবে পশ্চিমা পর্যবেক্ষক এবং ইতিহাসবিদরা এই বিষয়ে সন্দিহান। তাদের মতে, এই শান্তির আবরণের আড়ালে আধুনিক সাম্রাজ্যবাদী আচরণ লুকিয়ে আছে। দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের সামরিক তৎপরতা এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI)-এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারকে অনেকে আধুনিক সাম্রাজ্যবাদের রূপ হিসেবে দেখেন।
অতীতের প্রতিধ্বনি: চিয়াং কাই-শেকের সাথে মিল
মজার বিষয় হলো, শি জিনপিংয়ের এই ঐক্যের দর্শন তাঁর এক সময়ের প্রতিদ্বন্দ্বী চিয়াং কাই-শেকের আদর্শের সাথে অনেকটা মিলে যায়। ১৯৪৩ সালে চিয়াং কাই-শেক তাঁর ‘চায়নাস ডেস্টিনি’ বইতে দাবি করেছিলেন যে, চীনের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী আসলে "একই রক্তের" শাখা যা যুদ্ধের মাধ্যমে নয় বরং "সাংস্কৃতিক আত্তীকরণের" মাধ্যমে মিশে গেছে। বর্তমান কমিউনিস্ট পার্টির মতো চিয়াং-ও পশ্চিমা "স্বাভাবিক অধিকারের" ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এবং দাবি করেছিলেন যে, জাতীয় প্রতিরক্ষার স্বার্থে ব্যক্তিকে রাষ্ট্রের অধীনে থাকতে হবে।
ঐতিহাসিক সমালোচনা: ‘মিথ-হিস্ট্রি’ ও অসঙ্গতি
পিটার সি. পারডিউ-এর মতো ইতিহাসবিদরা মনে করেন, এই মহৎ ঐক্যের তত্ত্বটি "ঐতিহাসিকভাবে ত্রুটিপূর্ণ" এবং "যুক্তিহীন"। পারডিউ লক্ষ্য করেছেন যে, এই বর্ণনাটি চীনের বৈচিত্র্যময় অতীত থেকে কেবল সুবিধাজনক ঘটনাগুলো বেছে নেয় (cherrypicks) এবং একটি বিশাল সাম্রাজ্যের ইতিহাসকে জোর করে একটি আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের কাঠামোতে ফিট করার চেষ্টা করে। সামরিক বিজয় ও বিভিন্ন রাজবংশের মধ্যকার বিরোধের বাস্তবতাকে এড়িয়ে গিয়ে এটি একটি "মিথ-হিস্ট্রি" বা কল্পিত ইতিহাস তৈরি করে, যা মূলত স্বৈরাচারী শাসনকে বৈধতা দেওয়ার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে।
উপসংহার: এক ভঙ্গুর পরাশক্তি?
চীনের মতো একটি বৈশ্বিক শক্তি কেন অভ্যন্তরীণ ঐক্যের ওপর এত জোর দিচ্ছে? বিশ্লেষকরা মনে করেন, এর মূলে রয়েছে একটি "বৈধতার সংকট"। সমাজতান্ত্রিক লক্ষ্যগুলো ফিকে হয়ে আসা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অনিশ্চয়তার মুখে কমিউনিস্ট পার্টি তাদের শাসন টিকিয়ে রাখতে কনফুসিয়াসকে একটি ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে [২৪]। প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক সাফল্য সত্ত্বেও চীন সরকার একটি "ভঙ্গুর পরাশক্তির" মতো আচরণ করে, যা ভেতর এবং বাইরে থেকে সবসময় নিজেকে হুমকির মুখে মনে করে।
ভবিষ্যতে চীন কোন পথে হাঁটবে বিচ্ছিন্নতার "ইয়োলো রিভার" (Yellow River) মডেল নাকি বিশ্বের সাথে মিশে যাওয়ার উন্মুক্ত "ইয়াংজি" (Yangzi) মডেল তা দেখার জন্য বিশ্ব এখন অপেক্ষা করছে।
Before you go ...
We're building a community of experts dedicated to rebuilding trust and serving the public by making knowledge available to everyone. Join us at the beginning of our journey and receive a curated list of articles in your inbox twice a week. Be among our first subscribers!







