
ইসরায়েলের ‘মাবাম’ কৌশল: ইরানকে দমানোর লড়াই এবং মার্কিন সম্পর্কের টানাপোড়েন
BD Feature, Writter
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে অন্যতম আলোচিত বিষয় হলো ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদী সামরিক কৌশল, যা হিব্রু ভাষায় "মিভতসা বেইন মিলহামত" (Mivtsa Bein Milchamot) বা সংক্ষেপে 'মাবাম' নামে পরিচিত। সহজ ভাষায় একে বলা হয় “যুদ্ধের মধ্যবর্তী অভিযান”। এই কৌশলের মূল লক্ষ্য হলো সরাসরি যুদ্ধে না জড়িয়েও ইরান এবং তার আঞ্চলিক মিত্রদের সামরিক সক্ষমতাকে ক্রমাগত দুর্বল করে দেওয়া।
মাবাম কৌশলের উৎস ও বিবর্তন: যদিও ইসরায়েল প্রতিরক্ষা বাহিনী (IDF) ২০১৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে এই কৌশলটি নথিভুক্ত করে, এর চর্চা শুরু হয়েছিল আরও আগে। এর ঐতিহাসিক ভিত্তি নিহিত রয়েছে ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে জর্ডান, মিশর ও সিরিয়ার বিরুদ্ধে পরিচালিত "প্রতিশোধমূলক অভিযানে"। সাবেক ইসরায়েলি চিফ অফ স্টাফ গাদি আইজেনকোটের মতে, এটি প্রথাগত যুদ্ধের প্রস্তুতির চেয়ে ভিন্ন এক ধরণের প্রো-অ্যাক্টিভ ও আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ, যা অত্যন্ত উচ্চমানের গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়।
কৌশলগত লক্ষ্য ও বিস্তৃতি: শুরুতে এই অভিযানের প্রধান লক্ষ্য ছিল সিরিয়ায় হিজবুল্লাহর কাছে পৌঁছানো উন্নত ইরানি অস্ত্র ধ্বংস করা এবং গোলান হাইটসে সন্ত্রাসী অবকাঠামো গড়ে তোলা রোধ করা। তবে সময়ের সাথে সাথে এর পরিধি আরও বেড়েছে:
সিরিয়া: বিমান হামলা ও সাইবার আক্রমণের মাধ্যমে অস্ত্র সরবরাহ ব্যাহত করা।
ইরাক ও লেবানন: ২০১৯ সাল থেকে ইসরায়েল ইরাকের শিয়া মিলিশিয়াদের অস্ত্রের গুদামে এবং হিজবুল্লাহর নির্ভুল নির্দেশিত ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির লক্ষ্যবস্তুতে হামলা শুরু করে।
ইরান: সরাসরি ইরানের ভেতরে পারমাণবিক স্থাপনা, মিসাইল এবং ড্রোন সেন্টারে সাইবার হামলা ও গুপ্তহত্যার মতো গোপন অপারেশন চালানো হয়, যার উদ্দেশ্য ইরানের সামরিক সক্ষমতা কমিয়ে দেওয়া।
সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা: মাবাম কৌশলের মাধ্যমে ইসরায়েল হিজবুল্লাহর কাছে ইরানের নির্ভুল নির্দেশিত ক্ষেপণাস্ত্র পৌঁছাতে উল্লেখযোগ্যভাবে বিলম্ব ঘটাতে সক্ষম হয়েছে। তবে এর সীমাবদ্ধতাও কম নয়। উদাহরণস্বরূপ, ২০২০ সালে ইরানের একটি উন্নত সেন্ট্রিফিউজ স্থাপনায় হামলার পর ইরান তাদের কার্যক্রম আরও মাটির গভীরে সরিয়ে নেয়, যা ইসরায়েলি কৌশলের একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ফলাফল ছিল। এছাড়া, ২০২৬ সালের সংঘাত শুরুর আগে হিজবুল্লাহর হাতে প্রায় ১ লক্ষ থেকে ২ লক্ষ রকেটের মজুদ ছিল, যা এই কৌশলের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের ওপর প্রভাব: ইসরায়েলের এই মাবাম কৌশল বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওয়াশিংটন যখন ইরানের সাথে দীর্ঘস্থায়ী শান্তির জন্য আলোচনার পথ খুঁজছে, তখন ইসরায়েলের এই স্বাধীন সামরিক অভিযান সেই শান্তি প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ২০২৬ সালে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু মাবাম কৌশলের চেয়ে আরও সরাসরি সংঘাতের পথে হাঁটার ইঙ্গিত দিলেও, ইসরায়েলি নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা একে একটি অপরিহার্য কৌশল হিসেবে দেখেন। ভবিষ্যতে মার্কিন সমর্থন বজায় রাখতে হলে ইসরায়েলকে তাদের গোপন অভিযানের ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের সাথে আরও নিবিড়ভাবে সমন্বয় করতে হতে পারে, যা ইসরায়েলি নেতাদের জন্য একটি কঠিন শর্ত হতে পারে।
ইসরায়েলের মাবাম কৌশল মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখার একটি হাতিয়ার হলেও, এর ক্রমবর্ধমান পরিধি বৃহত্তর সংঘাতের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে এবং দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক শান্তির পথে একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
Before you go ...
We're building a community of experts dedicated to rebuilding trust and serving the public by making knowledge available to everyone. Join us at the beginning of our journey and receive a curated list of articles in your inbox twice a week. Be among our first subscribers!







