
‘দাদীর নাচ’ এবং ইরানি নারীদের আড্ডায় উঠে আসা জীবনের ৪টি অম্ল-মধুর শিক্ষা
BD Feature, Writter
নিষিদ্ধ কোনো কিছুর প্রতি মানুষের চিরকালই এক অদ্ভুত আকর্ষণ থাকে। কল্পনা করুন তেহরানের কোনো এক পুরনো দালানের ভেতর ঘনীভূত হওয়া এক আড্ডা, যেখানে একদল নারী প্রতি বুধবার তাসের আসর বসান। ইরানে যেখানে তাস খেলা সামাজিকভাবে নিষিদ্ধ, সেখানে এই নারীরা সমাজের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে একত্রিত হন কেবল একটুখানি মুক্তির খোঁজে। ঘরের কোণে ফুটতে থাকা দারুচিনি দেওয়া গরম চায়ের সুঘ্রাণ আর তাসের শব্দের আড়ালে লুকানো থাকে তাদের হাজারো না বলা গল্প। কৌতূহলী প্রতিবেশীর নজর এড়িয়ে তারা যখন এই ছোট পরিসরে নিজেরা নিজেদের মুখোমুখি হন, তখন কেবল তাস নয়, বরং জীবনের তাসগুলোও একের পর এক টেবিলে উঠে আসে। সাধারণ মানুষের এই আটপৌরে গল্পগুলো থেকেই আমরা পাই জীবনের সবচেয়ে গভীর কিছু দর্শনের সন্ধান।
শোক যখন আনন্দকে থামিয়ে দেয় (শোক ও উত্তরণের গল্প)
জীবনের আনন্দ অনেক সময় নির্দিষ্ট কোনো মানুষের উপস্থিতির ছন্দের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে। আড্ডার এক ফাঁকে উঠে আসে দাদীর সেই ফেলে আসা সোনালী দিনগুলোর কথা। দাদু যখন পরম মমতায় অ্যাকর্ডিয়ন বাজাতেন, দাদী তখন সব কাজ ফেলে, যে অবস্থায় আছেন সেখান থেকেই নেচে উঠতেন। দাদুর আঙুলের সেই সুরের জাদুর সাথে দাদীর নাচের তালের ছিল এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন। কিন্তু দাদুর প্রয়াণের সাথে সাথে সেই সুরের মায়াও যেন ফিকে হয়ে যায়। দাদীর জীবনের সেই সজীব ছন্দটিও মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে পড়ে। দাদুর মৃত্যু কেবল একজন মানুষকে কেড়ে নেয়নি, কেড়ে নিয়েছিল দাদীর নাচার ইচ্ছা আর মুখের হাসিকেও। এটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, প্রিয়জনের প্রস্থান কীভাবে আমাদের ভেতরের স্বতঃস্ফূর্ত প্রাণশক্তিকে নিস্তেজ করে দেয়।
"দাদু চলে গেলেন, আর তার সাথে সাথে দাদীর নাচও থেমে গেল। লোকে বলে, মাসের পর মাস তার মুখে এক চিলতে হাসির রেখাও দেখা যায়নি।"
‘আদর্শ’ স্বামীর হাস্যকর বাস্তবতা (গার্হস্থ্য জীবনের বিড়ম্বনা)
দাম্পত্য জীবনের ছোটখাটো স্বার্থপরতা বা বোকামিগুলো অনেক সময় এমনভাবে সামনে আসে, যা একই সাথে আমাদের হাসায় এবং দীর্ঘশ্বাসের কারণ হয়। আড্ডার এক নারী যখন তৃপ্তি সহকারে বলছিলেন যে তিনি স্টু-তে এবার দারুচিনি মিশিয়েছেন এবং তার স্বাদ দারুণ হয়েছে, তখনই স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের এক ‘ট্র্যাজিকমিক’ চিত্র ফুটে ওঠে। এক নারী স্মৃতিচারণ করেন, যখন তাদের প্রথম সন্তান অসুস্থ ছিল এবং প্রতি চার ঘণ্টা অন্তর ওষুধ খাওয়ানো লাগত, তখন তিনি সাহায্যের জন্য তার স্বামীকে ঘুম থেকে তুলেছিলেন। স্বামী অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে ওষুধের বোতলটি খুললেন ঠিকই, কিন্তু শিশুকে খাওয়ানোর বদলে নিজেই এক চুমুকে ওষুধটি খেয়ে আবার আরামে ঘুমিয়ে পড়লেন! আবার অন্য এক নারীর স্বামী ডিশ ধোয়ার কাজে সাহায্য না করে পরম করুণায় বলেছিলেন, "এখন থাক, কাল ধুইও।" এই ঘটনাগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় যে ঘরোয়া জীবনের ছোটখাটো বিড়ম্বনাগুলো মাঝে মাঝে কতটা কৌতুককর হয়ে উঠতে পারে।
নিখুঁত সম্পর্কের আড়ালের গল্প (বহুবিবাহ ও বিশ্বস্ততা)
বাইরের ফিটফাট চাকচিক্য বা মিষ্টি হাসি যে সবসময় সুখী জীবনের গ্যারান্টি দেয় না, তার উজ্জ্বল উদাহরণ আন্টি এফি (Auntie Effie) এবং তার স্বামী। আড্ডায় সবাই যখন তার স্বামীর গুণকীর্তন করছিলেন তিনি দীর্ঘদেহী, সব সময় হাসেন, এমনকি তার গা থেকে কোকোর (Cocoa) চমৎকার সুঘ্রাণ আসত তখন মনে হচ্ছিল তিনি বুঝি এক আদর্শ পুরুষ। কিন্তু সেই তথাকথিত আদর্শ স্বামীরই যখন গোপন দ্বিতীয় বিয়ের খবরটি প্রকাশ পায়, তখন মুহূর্তেই সেই তাসের ঘর ভেঙে পড়ে। বাইরের মধুর আচরণের আড়ালে লুকিয়ে থাকা বিশ্বাসঘাতকতা নারীদের এই আড্ডায় এক তিক্ত পাঠ হিসেবে ধরা দেয়। দাদী যখন বিদ্রূপ করে মন্তব্য করেন, তখন সেটি কেবল ব্যক্তির ওপর আক্রমণ নয়, বরং সমাজের তথাকথিত ‘ভদ্র’ মুখোশের প্রতি এক নীরব কষাঘাত।
"আন্টি এফির স্বামী হলো এক আস্ত ‘মিষ্টি কুমড়ো’ (Son of a peach)!" দাদীর এই কৌতুকপূর্ণ গালিটি আসলে সেই সব পুরুষদের প্রতি এক ধরণের বিদ্রূপ, যারা বাইরে মিষ্টি হলেও ভেতরে এক তিক্ত বাস্তবতা লুকিয়ে রাখে।
জীবনের কঠিন সত্য যখন কৌতুক হয়ে আসে
নারীদের একটি অদ্ভুত ক্ষমতা আছে—তারা জীবনের রূঢ়তম বাস্তবতাকে হাসির মোড়কে মুড়িয়ে হালকা করতে জানে। এটি তাদের টিকে থাকার একটি অন্যতম কৌশল (Coping Mechanism)। আড্ডায় এক নারী যখন শেয়ার করেন যে তার স্বামী সরাসরি তাকে বলে দিয়েছেন যে তার মৃত্যুর পরই তিনি অন্য নারী খুঁজবেন, তখন সবাই এক যোগে হেসে ওঠেন। বিষয়টি শুনতে রূঢ় মনে হলেও, এই নারীরা একে কৌতুক হিসেবেই গ্রহণ করেন। তারা জানেন যে জীবনের সবটুকু দুঃখ একা বয়ে নেওয়া সম্ভব নয়, তাই একে অপরের সাথে শেয়ার করে তারা মনের ভার লাঘব করেন। রূঢ় বাস্তবতাকে হাসির ছলে মেনে নেওয়ার এই শক্তিই তাদের জীবনের প্রতিকূলতার মাঝে টিকে থাকতে সাহায্য করে।
পুনরায় নাচতে শেখা (Finding the Rhythm Again)
পুরো আড্ডার গল্প শেষে যখন দাদীর নাতনি তার কাছে ফিরে আসে, তখন এক আবেগঘন মুহূর্তের সৃষ্টি হয়। শত শোক আর শূন্যতার মাঝেও দাদী যখন তার নাতনিকে পুনরায় নাচ শেখাতে শুরু করেন, তখন তা কেবল একটি নাচের শিক্ষা থাকে না—তা হয়ে ওঠে জীবন জয়ের এক নতুন প্রতীক। দাদুর সেই জাদুকরী আঙুলের সুর আর নেই ঠিকই, কিন্তু জীবনের স্পন্দন তো থেমে থাকে না। শোক কাটিয়ে পুনরায় সেই পুরনো ছন্দে ফিরে আসা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জীবন মানেই হলো ভাঙা-গড়ার খেলা।
সমাপ্তি ভাবনা: আমাদের জীবনের কঠিনতম সময়েও কি আমরা দাদীর মতো সেই পুরনো নাচের ছন্দ খুঁজে পেতে পারি? হয়তো সেই ছন্দটি আমাদের ভেতরেই লুকিয়ে আছে, কেবল একটুখানি সাহসের অপেক্ষা।
Before you go ...
We're building a community of experts dedicated to rebuilding trust and serving the public by making knowledge available to everyone. Join us at the beginning of our journey and receive a curated list of articles in your inbox twice a week. Be among our first subscribers!







