
পৃথিবীর আকৃতি সন্ধানের মহাকাব্য: একটি বৈজ্ঞানিক রোমাঞ্চ
BD Feature, Writter
১৮৫২ সাল। উত্তর মেরু বৃত্তের বরফশীতল নির্জনতা আর হাড়কাঁপানো বাতাসের ঝাপটায় যখন জনজীবন স্তব্ধ, তখন সুইডিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী নীলস হকভিন সেলান্ডার এক অতিমানবীয় অভিযানের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিলেন। গত ৪০ বছর ধরে তিনি এবং তাঁর পূর্বসূরি ফ্রিডরিখ উইলহেম ফন স্ট্রুভ এক আপাত সাধারণ প্রশ্নের উত্তর খুঁজছিলেন: "পৃথিবীর প্রকৃত আকৃতি কী?"

An 1860 map of Finland. The Struve arc is a later addition. Courtesy the National Land Survey of Finland
এই প্রশ্নটি কেবল মানচিত্র তৈরির জন্য ছিল না; এটি ছিল সাম্রাজ্য রক্ষা, সমুদ্রপথে জাহাজের নিখুঁত দিকনির্ণয় এবং মহাবিশ্বের মৌলিক নিয়মগুলো বোঝার লড়াই। একটি সামান্য ভুলের কারণে মাঝসমুদ্রে জাহাজডুবি হতে পারত অথবা ভুল প্রমাণিত হতে পারত ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীদের তত্ত্ব। কেন এই একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বিজ্ঞানীদের দশকের পর দশক উত্তর মেরুর তুষারঝড় আর প্রতিকূল ভূখণ্ডে কাটিয়ে দিতে হলো, তা কোনো থ্রিলার গল্পের চেয়ে কম রোমাঞ্চকর নয়।
নিউটনের চ্যালেঞ্জ: মহাকর্ষ বনাম সংশয়বাদ
১৬৮৭ সালে আইজ্যাক নিউটন যখন তাঁর 'প্রিন্সিপিয়া' (Principia) প্রকাশ করেন, তখন তিনি মহাকর্ষের একটি বৈপ্লবিক সূত্র দিয়েছিলেন: F_g \propto Mm/r^2। এখানে r হলো পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে দূরত্বের মান। নিউটন দাবি করেছিলেন, পৃথিবী একটি নিখুঁত গোলক নয়। যেহেতু পৃথিবী লাটিমের মতো নিজ অক্ষের ওপর ঘোরে, তাই কেন্দ্রাতিগ বলের কারণে এর বিষুবরেখা অঞ্চলটি বাইরের দিকে কিছুটা ফুলে উঠবে এবং দুই মেরু চ্যাপ্টা হয়ে যাবে। একে বলা হয় 'Oblate Spheroid' বা চ্যাপ্টা উপগোলক।
সংশয় বনাম তত্ত্ব: নিউটনের এই গাণিতিক ভবিষ্যদ্বাণী তৎকালীন বৈজ্ঞানিক মহলে এক বিশাল বিতর্কের জন্ম দেয়:
বিষয়:নিউটনের দাবি (Oblate Spheroid) ,সমালোচকদের ধারণা
আকৃতি, দুই মেরুতে চ্যাপ্টা উপগোলক। নিখুঁত গোলক অথবা ভিন্ন কোনো অনিয়মিত আকৃতি।
ভিত্তি: মহাকর্ষ এবং ঘূর্ণন বলের প্রভাব। পৃথিবীর অভ্যন্তরে উপাদানের কোনো সুনির্দিষ্ট টান নেই।
চ্যাপ্টা হওয়ার হার: বিষুবরেখায় ব্যাস মেরু অক্ষের তুলনায় ১/২৩০ ভাগ বেশি। এই হার অত্যন্ত নগণ্য অথবা ভুল।
নিউটনের এই ভবিষ্যদ্বাণী প্রমাণের ওপর তাঁর সমগ্র মহাকর্ষ তত্ত্বের ভাগ্য ঝুলে ছিল। যদি বিষুবরেখায় ব্যাস বেশি হয় (অর্থাৎ r এর মান বেশি হয়), তবে সেখানে মহাকর্ষ বলের টান কিছুটা কম হবে। এই পরিমাপটি কেবল ভূগোলের বিষয় ছিল না; এটি ছিল মহাকর্ষের সর্বজনীন সত্যতা প্রমাণের একটি লিটমাস টেস্ট। এই তত্ত্ব প্রমাণের জন্য প্রয়োজন ছিল পৃথিবীর মানচিত্র তৈরির এক বিশাল যজ্ঞ, যা শুরু হয়েছিল উত্তর ইউরোপের বরফে ঢাকা প্রান্তরে।

The approximate type of base apparatus used in the Struve land survey. Courtesy the David Rumsey Map Collection
মেরিডিয়ান আর্ক পরিমাপ: এক অতিমানবিক প্রচেষ্টা
স্ট্রুভ এবং সেলান্ডারের নেতৃত্বে পরিচালিত 'স্ট্রুভ জিওডেটিক আর্ক' (Struve Geodetic Arc) ছিল তৎকালীন বিজ্ঞানের এক বিশাল বিজয়। কৃষ্ণ সাগর থেকে উত্তর মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত প্রায় ২,৮২১.৮৩৩ কিমি দীর্ঘ একটি দ্রাঘিমা রেখা (Meridian Arc) পরিমাপ করার জন্য তাঁরা এক অবিশ্বাস্য কর্মযজ্ঞ হাতে নেন।
পরিমাপের যন্ত্রপাতি ও পদ্ধতি:
২৫৮টি আন্তঃসংযুক্ত ত্রিভুজ: পুরো পথকে বিশাল এক ত্রিভুজাকার জালে ভাগ করা হয়েছিল।
থিওডোলাইট: ছোট টেলিস্কোপের মতো এই যন্ত্র দিয়ে ত্রিভুজগুলোর কোণ বারবার মাপা হতো, যাতে এক মিলিমিটারের বিচ্যুতিও ধরা পড়ে।
স্পিরিট লেভেল ও রড: সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সঠিক উচ্চতা বজায় রেখে স্ট্যান্ডার্ডাইজড রডগুলোকে হাতে-কলমে একে অপরের সাথে জুড়ে দিয়ে মাইলের পর মাইল পথ মাপা হয়েছিল।
"২,৮২১.৮৩৩ কিলোমিটারের এই যাত্রায় প্রতিটি কোণ আর প্রতিটি মাপ ছিল প্রকৃতির সাথে এক নিরন্তর যুদ্ধ। জনমানবহীন পাহাড় আর বরফের চূড়ায় টেলিস্কোপ বসিয়ে কয়েক দশক ধরে নেওয়া এই উপাত্তগুলো কেবল সংখ্যা ছিল না, বরং পৃথিবীর প্রকৃত আকৃতির একটি 'ডিজিটাল ব্লুপ্রিন্ট' ছিল।"
বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে যখন পরিমাপের এই ধারা আরও বিস্তৃত হলো, তখন দেখা গেল রবার্ট ফ্রেডরিখ হেলমার্টের মতো বিজ্ঞানীরা ১,৬০০টিরও বেশি মাধ্যাকর্ষণ পরিমাপ সংগ্রহ করেছেন। এই বিশাল তথ্যভাণ্ডার প্রমাণ করল যে পৃথিবী সম্পর্কে আমাদের ধারণা আগের চেয়ে অনেক বেশি সূক্ষ্ম হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু যখন সমস্ত তথ্য একত্রিত করা হলো, দেখা গেল ফলাফলগুলো নিউটনের নিখুঁত হিসাবের সাথে হুবহু মিলছে না আর এই অমিলই জন্ম দিল নতুন এক বিজ্ঞানের।
'বিচ্যুতি' যখন আবিষ্কারের চাবিকাঠি
বিজ্ঞানীরা যখন উপাত্তগুলো বিশ্লেষণ করলেন, তাঁরা দেখলেন প্রাপ্ত মান নিউটনের ভবিষ্যদ্বাণীর (১/২৩০) সাথে মিলছে না। ল্যাপলাস এবং তাঁর সহকর্মীরা পৃথিবীর চ্যাপ্টা হওয়ার হার পেলেন ১/৩১২ এবং ১/৩৩৫.৭৮। সাধারণ মানুষের চোখে এটি হয়তো ভুল মনে হতে পারে, কিন্তু বিজ্ঞানীদের কাছে এই 'বিচ্যুতি' ছিল এক নতুন সত্যের ইঙ্গিত।
এই অমিলগুলো বৈজ্ঞানিক ব্যর্থতা ছিল না, বরং পৃথিবীর ভেতরের লুকানো জগতকে বোঝার চাবিকাঠি ছিল:
অভ্যন্তরীণ ঘনত্বের রহস্য: নিউটন ধরে নিয়েছিলেন পৃথিবীর সব জায়গার ঘনত্ব সমান। কিন্তু পরিমাপের পার্থক্য প্রমাণ করল যে, পৃথিবীর কেন্দ্র বা 'কোর' এর ভূত্বকের (Crust) চেয়ে অনেক বেশি ঘন।
পাহাড়ের লুকানো টান: বিজ্ঞানীরা দেখলেন বিশাল পাহাড়ের ভরের কারণে মাধ্যাকর্ষণ কিছুটা বিচ্যুত হয়। এই অমিলটিই ল্যাপলাসকে সাহায্য করল পৃথিবীর ভেতরের উপাদানের বিন্যাস বুঝতে।
তত্ত্বের বিবর্তন: এই 'ত্রুটি'গুলোই আমাদের বাধ্য করল নিউটনীয় মহাকর্ষের প্রয়োগকে আরও উন্নত করতে, যা পরে সিসমোলজি বা ভূ-কম্পনবিদ্যার জন্ম দেয়।
সহজ কথায়, পরিমাপের এই সূক্ষ্ম ত্রুটিগুলোই প্রথমবারের মতো মানুষের চোখের সামনে পৃথিবীর ভেতরের ইঞ্জিনের ঢাকনাটি খুলে দিয়েছিল।

Map of the geodetic survey of India by 1922, giving a sense of the scale and detail involved in precise measurements of Earth’s curvature
পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ রহস্য: ঘনত্ব ও টেকটোনিক্স
ভূ-পৃষ্ঠের এই সূক্ষ্ম পরিমাপগুলো ধীরে ধীরে আধুনিক ভূ-ভৌতিক বিজ্ঞানের (Geophysics) জন্ম দিল।
আইসোস্ট্যাসি (Isostasy): বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করলেন যে পাহাড়ের কাছে মাধ্যাকর্ষণ কেন ভিন্ন হয়। এখান থেকেই ধারণা এল যে পৃথিবীর ভূত্বক আসলে নিচের ঘন ম্যান্টলের ওপর ভাসমান একটি স্তরের মতো। এই ধারণাটিই পরবর্তীতে ২০শ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার 'প্লেট টেকটোনিক্স' বা পাত সংস্থান তত্ত্বের ভিত্তি গড়ে দেয়।'মহাজাগতিক আলু' বা জিওড (Geoid): আধুনিক বিজ্ঞান আমাদের শিখিয়েছে যে পৃথিবী কোনো মসৃণ উপগোলক নয়। মাধ্যাকর্ষণের তারতম্যের কারণে এর পৃষ্ঠতলে হাজার হাজার উঁচু-নিচু 'বাম্প' বা ঢেউ আছে। বিজ্ঞানীরা একে অনেকটা "মাধ্যাকর্ষণিক আলু" বা 'জিওড' হিসেবে বর্ণনা করেন। এই জিওড প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল—বরফ গলে যাওয়া বা ভূমিকম্পের কারণে এর আকৃতি সেন্টিমিটারের মাপে বদলে যায়।পরিমাপের প্রকৃত শিক্ষা
পৃথিবীর আকৃতি সন্ধানের এই মহাকাব্য আমাদের শিখিয়ে দেয় যে, বিজ্ঞানে পরিমাপ কেবল কিছু সংখ্যা নয়।
অ্যারিস্টটল বা গ্যালিলিওর যুগে পরিমাপকে মনে করা হতো তত্ত্ব প্রমাণের একটি মোটামুটি মাধ্যম। গ্যালিলিও যখন পেন্ডুলাম নিয়ে কাজ করতেন, তিনি ছোটখাটো বিচ্যুতিকে প্রকৃতির জটিলতা বলে এড়িয়ে যেতেন। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান দাঁড়িয়ে আছে সেই 'বিচ্যুতি'র ওপরই। সেলান্ডার বা স্ট্রুভের সেই কঠোর পরিশ্রম আমাদের শিখিয়েছে যে, সূক্ষ্মতম অমিলই আসলে বড় কোনো আবিষ্কারের সদর দরজা।
আমরা যখন কোনো কিছু মাপতে যাই, তখন আমরা আসলে সেই বিষয়টি সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে পরীক্ষা করি। নিউটন বা সেলান্ডারের গল্প আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে,
"আমরা যা জানি তা মাপার জন্য নয়, বরং আমরা যা জানি না তা খুঁজে বের করার জন্যই আমরা পরিমাপ করি।"
Before you go ...
We're building a community of experts dedicated to rebuilding trust and serving the public by making knowledge available to everyone. Join us at the beginning of our journey and receive a curated list of articles in your inbox twice a week. Be among our first subscribers!







